Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts
Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts

Tuesday, November 22, 2016

জীবন থেকে দেখা বাংলাদেশী ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসি (পর্বঃ ০২)

রাজনীতি নিয়ে কথা বলি, বলতে চাই। অধিকাংশ তরুণের "I hate Politics'' দর্শনের মাঝে কেন জানি আমিপলিটিক্সকেই খুব বেশী ভালবেসে ফেলেছি। রাজনীতি নিয়ে পড়তে, ভাবতে, জানতে ভাল লাগে। ইদানিংআমার একটা দারুণ রকমের সুবিধা হয়েছে। নিজের ছোট্ট জীবনে পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকেই রাজনীতির চেহারাকে বেশ ভালভাবে দেখতে পারি।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইন্টারফেস কি? চোখ বন্ধ করে একটু ভাবুন প্লিজ। রাজনীতি শব্দ উচ্চারনের বলতেই 'ভোট' আর 'ক্ষমতা'। 
তরুণ বয়সেই কিভাবে যেন 'ভোট' আর 'ক্ষমতার' সাথে মল্লযুদ্ধ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখান থেকেই আমি বাংলাদেশী রাজনীতির একটা নতুন ব্র্যান্ডের সন্ধান পেয়েছি। নাম দিয়েছি-বাংলাদেশী ব্র্যান্ড 'ডেমোক্রেসি'। 
বিশ্বাস করুন- ভোটের রাজনীতিতে অংশ না নিলে আপনি কখনোই আমার এই নিউ ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসির চেহারা দেখতে পাবেন না।

অনেকেই জানেন- বিগত ইউপি নির্বাচনে আমি বগুড়ার একটি ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছিলাম। আমার চেয়ে ৪০ বছরের সিনিয়র, আমার শিক্ষকের কাছে ১৬ ভোটে হেরে গিয়েছিলাম। এই ফলাফল নীরবে মেনে নেওয়া এবং নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান স্যারকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোকে কেন্দ্র করে আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ভয়ংকর এক কালিমা লেপন করে দেয়া হয়েছে- ''তা হিলারী প্রেসিডেন্সি পরাজয় এবং একজন বাংলাদেশী তরুনের পরাজয়'' শিরোনামে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছিলাম। আজ ঠিক সে রকমই আরেকটু রাজনৈতিক জটিলতার উপাখ্যান তুলে ধরছি। আগেই বলে রাখি- আমি খুব দুর্বল ও ছোট মানুষ। নিজের ছোট্ট রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেই রাজনীতি নিয়ে কথা বলছি। আমি জানি- কিছু ভাই- আমার এই আত্মকেন্দ্রীক বর্ণনায় উষ্মা প্রকাশ করবেন। আপনাদের বিরক্তির কারণ হওয়ায় ক্ষমা চেয়ে সচেতনভাবেই দায় নিচ্ছি। নিজের জীবন থেকে বলার সুবিধা হলো- কনফিডেন্সের সাথে একদিকে অবস্থান নেয়া যায়।

আমি যেমন নিউ ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসিতে বড় সংকট হিসেবে দেখছি- সাধারন নাগরিক ও ভোটারদের চিন্তা ও আকাঙ্খার দৈণ্যতাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় সংকট। এই লিখার উপসংহারে লাইনটি এমন হতে পারে- "সূতরাং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যর্থতার বড় দায়টি নাগরিকদের কাঁধে।'' এই লাইনটি পড়ে আমাকে যারা ইতোমধ্যে বকাঝকা শুরু করেছেন, তাদের ধন্যবাদ এখন একবার জানিয়ে- এই লিখার শেষেও একবার ধন্যবাদ দিতে চাই। ততক্ষণ মনে মনে বকা দিয়ে লিখাটি পড়তে থাকুন প্লিজ।

উত্তরবঙ্গে শীত বেশ ভালভাবেই জেঁকে বসেছে। শীতের মৌসুম মানেই গ্রামে ওয়াজ মাহফিলের মৌসুম। অধুনা তার নাম হয়েছে তাফসীর মাহফিল। এসএসসি পর্যন্ত গ্রামে ছিলাম। দুর-দুরান্তে বাবা, চাচা এবং গ্রামের মুরুব্বীদের সাথে ওয়াজ শুনতে যেতাম। সত্যি বলতে কি- ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজিনের ওয়াজ আমার মোটেই ভাল লাগতো না। আমি সেই ছোট্ট বয়সেই বুঝতাম- এই হুজুরেরা কোকিল কণ্ঠী, মিষ্টভাষী, আন্তর্জাতিক মুফাসসিরে কোরআন, ইসলামী বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হলেও বাস্তবে এরা টাকার চুক্তি করে ওয়াজ করতে এসেছেন। এই একটি কারনেই তাদের ওয়াজ আমার মোটেও সহ্য হতো না। আর ওয়াজে কিসের তাফসীর? সুরের নহর বইয়ে দিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীতে ভরপুর কিছু জাহেলী কথাও বলতে শুনেছি। ইসলামের প্রানসত্বা নিয়ে মোটেও কোন কথা থাকতো না। ওয়াজ শেষে যে ভাষায় চাঁদা কালেকশন করতো, তাতে ১০/২০ টাকার বিনিময়ে জান্নাতে রাইয়ান পাওয়া যেতো। আর হাজার টাকা হলেও কনফার্ম জান্নাতের টিকেট। হুজুর বলছেন- 
যে দিবে টাকা দশ/
জান্নাতে যাবে ফসাফস/ (আঞ্চলিক ভাষায় ফসাফস মানে কোন বাঁধা ছাড়াই)
হুজুরদের ওয়াজ শোনার ন্যুনতম কোন ইচ্ছা না থাকা সত্বেও মাহফিলে যেতাম। মাহফিলে যেতাম- প্রধান অতিথী ও বিশেষ অতিথীর বক্তব্য শোনার জন্য। আপনাদের কাছে হাস্যকর হলেও এটাই আমার জীবনে সত্য। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম রাজনীতিবিদ হবো। তাই রাজনীতিবিদরা ওয়াজ মাহফিলে এসে কিভাবে নিজেদের এপ্রোচ করে, কথা বলে, পাবলিক রিলেশন করে- খুঁটেখুঁটে দেখতাম। নিজেকে অতিথীদের আসনে কল্পনা করে রিহার্সেলও করতাম। ভুলে যাবেন না- আমি তখন ক্লাস সেভেন/এইটের ছাত্র। নেতৃত্বের লোভ, ক্ষমতা ও রাজনীতির বেনিফিট সে অর্থে বুঝার বয়স তখনো হয় নি। স্রেফ রাজনীতি ভাল লাগতো- এই জায়গা থেকেই নিজেকে দেখতাম। বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের সামাজিক ইনফ্লুয়েন্স আমার কিশোর মনে ইনফ্লুয়েন্সিভ হওয়ার বীজ বুনেছিলা।

গত ১৫ দিনে আমার কাছে কমপক্ষে ১০ টি ফোন এসেছে। এলাকার বিভিন্ন গ্রামের তাফসীর মাহফিলে অতিথী হওয়ার দাওয়াতের ফোন। সেই কিশোর বয়সের হাস্যকর স্বপ্ন যুবক বয়সেই বাস্তবে সামনে চলে আসবে- ভেবে শুধু হাসছি আর আগের দিনের ছেলেমানুষির কথা চিন্তা করছি। আমি বিনয়ের সাথে সকল দাওয়াতকে গ্রহন করেছি। কিছুটা রোমাঞ্চ তো আছেই। নামিদামী মানুষের সাথে আমিও গনমানুষের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসবো- ব্যক্তিপূজার জায়গা থেকে অনেক আকর্ষনীয় ব্যাপার। দূর্বল মানুষ হিসেবে আমারও ভাল লাগার বিশাল একটা উপলক্ষ এখানে আছে। আমি অতিথি হিসেবে ৫/১০ মিনিট বক্তব্য দেয়ার একটা খসড়া নোটও তৈরি করে ফেলেছি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করেছি কিনা- সেটি অনলাইনে না বলি; আয়না, আমি আর আমার বউ জেনে থাক। এভাবে ওয়াজ মাহফিলের প্রস্তুতির মাঝেই জীবনকে বেশ সরেস উপভোগ্য মনে হতে লাগলো। ঢাকা থেকে এখন আমি এলাকায় যাচ্ছি- দাওয়াতী মেহমান হিসেবে। এলাকায় মাইকিং হচ্ছে আমার নামে। আমার জায়গায় আপনাকে কল্পনা করুন- বেশ তৃপ্তি পাবেন ( যদি আমার মত দূর্বল ঈমানদার হোন, তাহলেই কেবলমাত্র)।

আমার পৃথিবী আরেকবার উল্টে গেল। বাংলাদেশী ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসির আরেকটি পৃষ্ঠা পড়তে হলো। আমার রোমাঞ্চ নিমেষেই উবে গেল। আমি এক নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর সামাজিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হলাম। লড়াই বলবো না। কেন এই বিশ্রী লড়াইয়ে আমি জিততে চাওয়া তো দূরের কথা অংশগ্রহনই করতে চাই না।
এলাকায় মাইকিং হচ্ছে- উক্ত মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ............... বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি..................... বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত থাকবেন থানা বিএনপির সভাপতি......... বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত থাকবেন সাবেক ছাত্রনেতা নূর মোহাম্মাদ আবু তাহের। আরো উপস্থিত থাকবেন............

এবার পাবলিক রিএকশন দেখুন। আচ্ছা- আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানের সাথে একই অনুষ্ঠানে নূর মোহাম্মাদ কেন? আওয়ামী লীগের থানা সভাপতির সাথে একই অনুষ্ঠানে নূর মোহাম্মাদ কেন? তবে কি আওয়ামী-জামায়াত আঁতাত? তবে কি নূর মোহাম্মাদ বিক্রি হয়ে গেল? তবে কি নূর মোহাম্মাদ আদর্শ্চ্যুত হয়ে গেল? তবে কি নূর মোহাম্মাদ ......... হ্যান-ত্যান।

নির্বাচনের কর্মীবৃন্দ ফোনের পর ফোন দিতে থাকলো। এভাবে মাহফিলে আসা যাবে না। এভাবে আওয়ামী লীগের সাথে একই মঞ্চে ওঠা যাবে না। এভাবে এটা করা যাবে না। এলাকায় লোকজন ভুল ভাবছে। ............

আমি তখন হাসছি আর হাসছি। বাংলাদেশের নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখেই হাসছি। রাজনীতির পাঠ পেয়ে হাসছি। এক অসহিষ্ণু রাজনীতির দীক্ষা পাচ্ছি। আমাকে যারা ভালবাসেন তারাও প্রশ্ন তুলছেন। যারা ঘৃণা করেন তারাও প্রশ্ন তুলছেন। যারা বিরোধীতা করেন তারা তো মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে গেছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার-সাধারণ নাগরিকরা পর্যন্ত ভাবছেন, আমার কোনভাবেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যানের সাথে একই মঞ্চে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও বসা উচিৎ হবে না। আমরা অনেকেই বলি- জামায়াত গনমানুষের আকাঙ্খাকে ধারণ করতে পারে না, লালন করতে পারে না। আমার এলাকার গনমানুষের আকাঙ্খা হচ্ছে- বিপরীত আদর্শের রাজনীতিবিদদের সাথে কোন বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রাখা যাবে না। একই মঞ্চে ওঠা যাবে না। আর জামায়াত আমাকে বিপরীত আদর্শের মানুষদের সম্মান করতে শিখিয়েছে, ভিনমতের মানুষের কাছে যেতে বলেছে। ভিন্নমতের মানুষদের সাথে একই মঞ্চে বসলে আমাকে শোকজ করা হয় না। এখন আমি বুঝতে পারছি না- গনমানুষের আকাঙ্খাকে লালন করে ভিন্নমতের আদর্শের সকল মানুষদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবো, নাকি গনমানুষের বিপরীতে গিয়ে তাদের সাথে সম্পর্ক অব্যাহত রাখবো? আমি কি ভিন্নমতের মানুষদের সামাজিকভাবে বয়কট করবো, না কি তাদের কাছাকাছি যাব?

আমি এই স্ট্যাটাস পাবলিকলি দিচ্ছি। আমার এলাকার অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী এই স্ট্যাটাসে বর্ণিত সংকটের সত্যতা নিরুপণ করবেন। আমি সত্যিই এক মানসিক সংকটে ভুগছি। রাজনীতি করতে গিয়ে কখনো ভয় পাইনি। শ্বাপদ-সংকুল পথ পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জেল-জুলুম-নির্যাতন, গ্রেফতার- শাহাদাতকে কবুল করেই এ পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু বাস্তব ময়দানে গনমানুষের সাথে রাজনৈতিক ময়দানে গিয়ে আমি গনমানুষের আকাঙ্খার যে দিকটি দেখছি- তাতে সত্যিই ভীষন ভয় পেয়ে গেছি। ভড়কে গেছি। হয়তো এই আকাঙ্খার সাথে অভ্যস্থ নই। সাধারণ মানুষ যেটাকে অন্যায়, আপোষকামীতা, আঁতাত বিবেচনা করছেন, সেটিকে আমি 'আদর্শিক অবস্থান' বিবেচনা করছি। কমন পিপলের সাথে এই সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে কতটুকু পথ চলতে পারবো জানি না।

একটি বিষয় পরিস্কার- বাংলাদেশী ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসিতে আপনি যতক্ষণ ভিন্ন আদর্শের সাথে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে লিপ্ত আছেন, মঞ্চে উঠে গালাগালি করতে পারবেন, পিষিয়ে মারতে চাইবেন, তাদের ধুইয়ে দিতে পারবেন, ততক্ষন আপনি স্ব-আদর্শের উপরে আছেন বলে বিবেচিত হবেন। আপনি আঁতাত করেন নি বলে বিবেচিত হবেন। কিন্তু যখনই আপনি উদার বুকে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিবেন, পরাজিত হয়ে বিজয়ী প্রার্থীকে সহযোগীতা করবেন, তার সাথে সামাজিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখবেন, একই মঞ্চে উঠবেন, শ্রদ্ধার চোখে দেখবেন- তখনই আপনি আদর্শ্চ্যুত, আঁতাতকারী, আমানতের খেয়ানতকারী বলে বিবেচিত হবেন।

ওয়াল্লাহি- বাংলাদেশে আওয়ামী রাজনীতির দর্শন ও আদর্শকে প্রচন্ড ঘৃণা করি। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ইসলামী আন্দোলনকে ফেরাউনি স্টাইলে দমিয়ে দেওয়ার কারিগর আওয়ামী জাহেলী দলকে আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। যতদিন বাঁচবো, সেক্যুলার আওয়ামী রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করেই বাঁচবো ইনশাআল্লাহ। কিন্তু আমি দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলি- এলাকার আওয়ামী-বিএনপি সহ আমার বিপরীত আদর্শের প্রত্যেকের কাছে আমি গিয়েছি, যাই এবং ভবিষ্যতেও যাব। কিন্তু বাংলাদেশী ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসিতে সাধারণ মানুষের যে চরিত্র ও আকাঙ্খা দেখেছি- সেখানে অনেক দূরের পথ পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া উপায় নেই। দিল্লী দূর অস্ত।

আমি স্ট্যাটাসের মাঝে লিখেছিলাম ---এই লিখার উপসংহারে লাইনটি এমন হতে পারে- "সূতরাং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যর্থতার বড় দায়টি ভোটারদের কাঁধে।'' উপসংহারে সেটি না লিখে লিখছি- "সূতরাং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যর্থতার বড় দায়টি নাগরিকদের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিতে আদর্শিক রাজনীতিবিদদের অনেক দূরের পথ পাড়ি দেয়ার হিম্মত থাকতে হবে"।

Thursday, November 10, 2016

হিলারীর প্রেসিডেন্সি পরাজয় এবং একজন বাংলাদেশী তরুণের পরাজয়



গনতন্ত্র, নির্বাচন, সহনশীলতা ও উদারতা, ফলাফল মেনে নেওয়া- কথাগুলো নির্বাচনকালীন সময়ে খুব বেশী উচ্চারিত হয়। গত পরশুর আমেরিকার নির্বাচন, ট্র্যাম্পের বিজয়- হিলারীর পরাজয় দেখছিলাম আর মনের কোনে কিছু ভাবনারা এসে উঁকি মারছিল। ফেসবুকে ও টুইটারে খুব খেয়াল করে আমেরিকার নির্বাচন ফলো করছিলাম। খুব ছোটবেলা থেকেই বাবাকে নির্বাচনের প্রক্রিয়াতে দেখেছি এবং মাত্র ২৮ বছর বয়সে নিজের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নির্বাচন করার ফলশ্রুতিতে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। আপনা্রা অনেকেই স্ব-স্ব জায়গাতে অনেক বড় মানুষ হলেও হয়তো বা নির্বাচনী মাঠে প্রার্থী হয়ে আমাদের সমাজব্যবস্থা, নির্বাচন কাঠামো, গনমানুষের দর্শন এবং বাংলাদেশী ব্র্যান্ডের ডেমোক্রেসীর চরিত্র দেখার সুযোগ হয়নি। আমার ব্যক্তিজীবন থেকে আমেরিকান ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসি এবং বাংলাদেশী ব্র্যান্ড ডেমোক্রসির মাত্র একটি বেদনাদায়ক চরিত্র উল্লেখ করছি।

এক, 

আমেরিকার নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী হিলারী ক্লিনটনের পরাজয়ের পরের ভাষনের শুরুর কয়েকটি লাইনে চোখ বুলিয়ে নিন।
"Thank you, my friends. Thank you. Thank you. Thank you so very much for being here. I love you all. Last night I congratulated Donald Trump and offered to work with him on behalf of our country. I hope that he will be a successful president for all Americans. This is not the outcome we wanted or we worked so hard for, and I'm sorry we did not win this election for the values we share and the vision we hold for our country."

দুই,
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের চরম জুলুম-নির্যাতন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও প্রতিপক্ষ দমনের উৎসবের মাঝেও যৌবনের সেরা সময়ে ছাত্রসংগঠনে দায়িত্বপালনরত অবস্থায় প্রার্থী হয়ে ঝুঁকি নিয়েছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে- যেদিন ঢাকা ছেড়ে এলাকায় ক্যাম্পেইন করতে বাসে উঠেছিলাম, তখন ঢাকা শহরকে দেখছিলাম আর অশ্রুনয়নে ভাবছিলাম- আর বুঝি কখনো এই চেনা শহরে ফেরা হবে না। ধরে নিয়েছিলাম- নির্বাচনকালীন সময়েই হয়তো কারাগারের ভেতর খন্ডকালীন বসতি অথবা ক্রসফায়ারের নাটকে কবরে স্থায়ী বসতি হতে পারে। আল্লাহ্‌ যতটুকু বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়েছেন, তা ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছি, ক্যাম্পেইন করেছি। আমি যখন ক্যাম্পেইন শুরু করি- প্রতিদ্বন্দ্বী সকল প্রার্থী-সমর্থকরা শ্লেষের হাসি হাসতো, 'পিচ্চি চেয়ারম্যান' বলে টিপ্পনী কাটতো, রাঘব-বোয়ালদের তুলনায় আমাকে 'ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা' বলতো। হজম করেছি। নীরবে আমি আমার লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে আমাদের স্বপ্ন, পরিকল্পনা ও এজেন্ডার কথা ঘরে-ঘরে, অলিতে-গলিতে, হাটে-বাজারে, প্রতিটি জনপদে বলার চেষ্টা করেছি। প্রতিপক্ষের ছিল অর্থ, প্রভাব, ক্ষমতা। আমাদের ছিল বিশ্বাস, পরিশ্রম আর নির্লোভ কর্মীবাহিনী। আল্লাহ্‌ তায়ালার অপার রহমতে ইউনিয়নের জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছিল। মাত্র ১৬ ভোটে পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় হয়েছি। যিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক দু'বারের চেয়ারম্যান। যিনি তৃতীয় হয়েছেন, তিনি সাবেক দু'বারের চেয়ারম্যান। যিনি চতুর্থ হয়েছেন তিনি সাবেক একবারের চেয়ারম্যান। যিনি পঞ্চম হয়েছেন তিনি এলাকার শিল্পপতি। আল্লাহ্‌ আমার মত নস্যি একটা তরুণকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। রাঘব-বোয়ালদের মোকাবেলায় ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা হয়ে ওনাদের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলাম।

তিন,
এতক্ষনে নিশ্চয় ভাবছেন- আমেরিকার প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে হিলারীর পরাজয়ের সাথে আমার মত ছোট মানুষের ইউপি নির্বাচনের পরাজয়ের আলোচনার হেতু কি? 
হ্যাঁ, হেতু আছে। গত মে মাস থেকে বুকে বিশাল কষ্টের পাহাড় চেপে নিয়ে পথ চলছি। ডেমোক্রেসি ও ইলেকশন প্রসেস নিয়ে যারা অবিরত কথা বলছেন, তাদের সর্বপ্রথম বাংলাদেশী সমাজব্যবস্থার চিরায়ত দর্শন এবং গনমানুষের চিন্তা-ভাবনার ব্যাপারে অধ্যয়ন করা দরকার।

ট্র্যাম্প তার ক্যাম্পেইনে কি জঘন্য ভাষায়ই না হিলারীকে আক্রমন করলো। হিলারী অযোগ্য, টেরোরিজমের গডমাদার, শারীরিকভাবে আনফিট, যুদ্ধবাজ, মহিলা প্রার্থী বলা সহ অপমানজনক অনেক কথা বললো। এমনকি পরাজিত হলে ফলাফল মানবেন না বলে ট্র্যাম্প সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন। আমেরিকার সকল মিডিয়া হিলারী পক্ষে ভূমিকা রাখলো। বিশ্বের প্রায় সকল মানুষ (রাশিয়া ছাড়া) বাস্তবিক কারনেই হিলারীর শিবিরে অবস্থান নিল। নির্বাচন হলো। ফলাফল হলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে হিলারী হেরে গেলেন। জিতলেন এক উন্মাদ মানুষ। এখন এই ভদ্র মহিলার মানসিক অবস্থার কথা একবার চিন্তা করুন তো? কেমন হওয়া উচিৎ রিএকশ্যন? শুনুন হিলারীর মুখেই- 
Last night I congratulated Donald Trump and offered to work with him on behalf of our country. I hope that he will be a successful president for all Americans.

এটিই ডেমোক্রেসির essence of Beauty. এটি গনতন্ত্র। এটিই নির্বাচন। সহনশীলতা ও উদারতা একেই বলে। এটিই আমেরিকান ব্র্যান্ড ডেমোক্রেসি। আপনাদের অনেকের মনে আছে ব্যারাক ওবামার কাছে পরাজিত হয়ে সিনেটর জন ম্যাককেইন বলেছিল- From today, Obama is my president.

চার, 
২৮ শে মে, ২০১৬। সন্ধ্যাবেলা। আমার ইউনিয়নের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনা হলো। আমি কৌশলে প্রত্যেক কেন্দ্রের এজেন্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষনা করার আগেই ফলাফল জেনে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। ৪.০০ টার সময় ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়েছিল। সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই আমি সোর্স থেকে ফলাফল পেয়ে বুঝে গেলাম ১৭ ভোট শর্ট (পরে অবশ্য ১৬ ভোট গ্যাপ হয়েছিল)। আমি আমার নির্বাচনী মূল অফিস থেকে উঠে গিয়ে বাজারের মসজিদে গেলাম। সেজাদায় পড়ে আল্লাহ্‌র কাছে জানতে চাইলাম- এখন আমার কি করা উচিৎ? তিনটি কাজ করতে পারতাম- বিনাবাক্যে ফলাফল মেনে নেওয়া, ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে মামলা করে পুনরায় ভোট গণনা্র ব্যবস্থা করা, কেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগিয়ে ভোটের ফলাফল স্থগিত করা। সিজদা থেকে উঠে বিনাবাক্যে ফলাফল মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়াবাড়ি, আদালতের স্বেচ্ছাচারিতা সহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে হঠকারিতার দিকে যাওয়াকে ভাল মনে করিনি। বিশেষ করে আমার রাজনৈতিক দল আমাকে বরাবরই সহনশীল ও উদার রাজনীতির শিক্ষা দিয়েছে।

একটু পরেই আনুষ্ঠানিক ফলাফল হলো। যথারীতি ১৬ ভোট শর্ট। কর্মী-সমর্থকরা ইমোশোনাল হয়ে যাচ্ছিল। কে যেন কানের কাছে এসে বললো- ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে উপজেলা নির্বাচন অফিস ঘেরাও কর্মসূচী ঘোষনা করে দাও। আমি একটা উঁচু চেয়ারের উপর উঠে ঠান্ডা মাথায় বক্তব্য দিলাম। ফলাফল মেনে নিলাম। কর্মীদের আবেগতাড়িত না হয়ে ফলাফল মেনে নেওয়ার অনুরোধ করলাম। নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান সাহেবকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সালাম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলাম। কর্মীরা মনঃক্ষুণ্ণ হলেও মেনে নিল। সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম।

রাত ১২.০০ টার দিকে নতুন চেয়ারম্যান আমাকে ফোন দিলেন। আমি শুভেচ্ছা জানালাম আর ওনি আমাকে শান্তনা দিলেন। পরের দিন আমার বাসায় আসার অনুমতি চাইছিলেন। ওনার সাথে আমার বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে ৫০ বছর। আমার বাবার সরাসরি শিক্ষক। বিনয়ের সাথে ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম- 'বাসায় স্বাগতম স্যার। তবে আমিই আপনাকে সকালে শুভেচ্ছা জানাতে আসবো ইনশাআল্লাহ্‌।' পরের দিন ২৯ শে মে সকালে ওনার নির্বাচনী অফিসে গিয়ে শুভেচ্ছা জানালাম। ওনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, কপালে চুমো দিলেন, দোয়া করে দিলেন। ওনার গলার মালা খুলে আমাকে পড়িয়ে দিলেন। উপস্থিত সকলের উদ্দ্যেশ্যে আমাকে কথা বলার সুযোগ দিলেন। আমি সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে পরাজয় স্বীকার করে নব নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে বরণ করে নিয়েছিলাম। দ্যাটস অল।

পাঁচ,
এরপর আমি এক নিষ্ঠুর পৃথিবীর মুখোমুখি হলাম। এ এক অন্য রকমের পৃথিবী। আমাকে পছন্দ করতো না এমন লোক তো অবশ্যই ছিল। নির্বাচনের মাঠে তারা নাস্তানাবুদ হয়ে গিয়েছিল। বাঘা-বাঘা তিন চেয়ারম্যানকে টপকিয়ে আমি আশাতীত ফলাফল করেছিলাম। যারা আমাকে ভোট দেয়নি, তারাও ১৬ ভোটের পরাজয় দেখে ব্যথিত হয়েছিল। অনেকে আগামী নির্বাচনে আমাকে বিপুল ভোটে জয়লাভের স্বপ্ন দেখিয়ে শান্তনা দিচ্ছিলেন। এলাকাজুড়ে আমাকে নিয়ে এক তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে গেল। ঠিক এমন সময়েই শত্রুরা আগামীদিনের রাজনীতিতে আমাকে বিব্রত করার রসদ তৈরী করে নিল। আঁধারের খেলোয়ারড়া সক্রিয় হয়ে উঠলো। এলাকাজুড়ে প্রশ্ন তুললো-

  •  মাত্র ১৬ ভোটে পরাজিত হয়ে কেন ফলাফলে মেনে নিলাম? 
  •  কেন ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে মামলা করলাম না?
  •  কেন নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যানের অফিসে শুভেচ্ছা জানাতে গেলাম? 
  •  কেন নতুন চেয়ারম্যান আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করলেন এবং আমি ওনাকে কেন বরণ করে নিলাম। তাহলে কি  আগে থেকেই গোপন সমঝোতা ছিল? 
  •  নতুন চেয়ারম্যান কেন আমার প্রশংসা করলো? 
  •  রাজনৈতিক ও আদর্শিক শত্রু প্রতিপক্ষ চেয়ারম্যান প্রার্থীর সাথে সাক্ষাৎ করলাম কেন? 
..............................................................................
..............................................................................
কেন? কেন? কেন? কেন? প্রশ্নের যেন শেষ নেই আর !

এক কান, দু'কান করে পুরো ইউনিয়নব্যাপী আমার বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর অপপ্রচার শুরু হয়ে গেল। সাধারন মানুষদেরকে পর্যন্ত ওরা কনভিন্স করলো- 'নূর মোহাম্মাদ চেয়ারম্যান পদে জিতে গিয়ে চেয়ার ছেড়ে দিয়েছে।' আমার পৃথিবীটা ছোট হতে লাগলো। ফেসবুকে অনেক শিক্ষিত লোকজনও আমাকে নিয়ে ইনবক্সে উষ্মা প্রকাশ করলো। পরিবারের লোকজনও বকাঝকা শুরু করলো। সাংগঠনিক ভাইদেরও উত্তর দিয়ে খুশী করতে পারছিলাম না। এলাকার অনেক নাগরিক ভোটারবৃন্দ আমার এই 'মারাত্মক অপরাধে' কষ্ট অনুভব করলো। কিছু মানুষ তো বিশ্বাস করে বসলো- আমার বাক্সে ভোট পড়লেও আমি আসলে সেসব ভোট অন্য প্রার্থীকে দিয়ে দিয়েছি। নির্বাচনে পরাজয়ে কি আমি শ্বান্তনা পাবো, উল্টো আমাকে বিভিন্ন এলাকা সফর করে শুভেচ্ছা জানানোর ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছিল। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ১৬ ভোটের পরাজয় আমাকে যতটা কষ্ট দেয় নি, ভোটের পরের ফলাফল মেনে নেয়া এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের এই ঘটনা আমার বুকে বিশাল এক কষ্টের পাথর চাপিয়ে দিল। আমি রাতে একাকী গুমড়ে কাঁদতাম। জীবনের শুরুতেই এতবড় একটা পরাজয় উদার বুকে মেনে নিয়েছিলাম, বিজয়ী চেয়ারম্যানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম- সবাই এটাকে স্যালুট করবে। আমার ভদ্রতা ও সৌজন্যতাকে সম্মান করবে। নাহ- আমি নিষ্ঠুর প্রত্যাঘাত পেলাম। আমি বাংলাদেশী সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির পাঠ তখনো ভালভাবে শিখতে পারি নি।

ছয়ঃ
এই ঘটনা আমার চিন্তার জগতে আমুল পরিবর্তন এনে দিল। ভবিষ্যতে আর কখনো ভোটের রাজনীতিতে অংশগ্রহন করবো কি না জানি না। গতকালের সিএনএন এ হিলারীর ভাষন শুনছিলাম আর আমার জীবনের সাথে কথাগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। আপনারা হিলারী ভাষনকে কিভাবে নিয়েছেন জানি না। তবে আমি ভাষন শুনে আমেরিকান ডেমোক্রেসি এবং বাংলাদেশী ডেমোক্রেসির একটা ক্ষুদ্র পার্থক্যকে জীবন থেকে দেখছি। ডেমোক্রেসির বিউটি দেখার আগে আমাদের সমাজের নাগরিক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের চিন্তার রাজ্যকে আগে পরিমার্জিত করতে হবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিই আমাদের পুড়িয়ে মারছে। হিলারী আজ প্রতিপক্ষ ট্র্যাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে নিশ্চয় প্রশংসিত হচ্ছেন। আর আমি ছোট একটা ইউনিয়নে স্রেফ একই কারণে অনেকের কাছে নিগৃহীত হয়েছি।

মুখে ডেমোক্রেসি ডেমোক্রেসি বলে যতই ফেনা তুলি না কেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে যতই দোষারোপ করি না কেন- নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের দায় এড়াতে পারি না। 

Saturday, November 5, 2016

বিএনপির উচ্চমার্গের পররাষ্ট্রনীতি

পিএইচডি করার ইচ্ছে ছিল না। ইদানিং হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মী বলেই কিনা ! টপিকও ঠিক করে ফেলেছি। এখন আপনারা সায় দিলেই একশ্যান শুরু করবো। আপনাদের 'সায়' নেয়ার প্রাসঙ্গিকতা আছে। কারণ- পিএইচডি কালীন সময়ে আপনাদের সাহায্য ব্যতিত আমি কোনভাবেই সফল হতে পারবো না। ওকে, ভূমিকা বাদ। আগে বলে নিই- আমার পিএইচডি গবেষনার টপিক কি?

''বিএনপির রাজনৈতিক কূটনীতি ও দুর্বোধ্য পররাষ্ট্রনীতি''। ইতোমধ্যে যারা পিএইচডি করেছেন অথবা করছেন- তারা এই টাইটেল দেখে নাখোশ হলেও আমার কিচ্ছু করার নাই। আমি এইটা নিয়েই কাজ করবো। একাডেমিক সংজ্ঞায় এটি কতটা জ্ঞাণগর্ভ রিসার্চ হবে জানি না। কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে এ ধরনের একটি রিসার্চের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, বেশ কিছুদিন ধরে। কেউ এগিয়ে আসছে না, বিধায় কি আর করার?

থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেয়ার হুমকী শুনি প্রায়শই। বাস্তবেও তা ঘটে। এই যেমন শরীয়তপুরে ছাত্রলীগ নেতার থাপ্পড়ে থানার এসআই এর দাঁত পড়ে গেল। তাই বলে থাপ্পড় মারলে যে পররাষ্ট্রনীতিও চীন থেকে ঘুরে দাদার দেশে চলে আসে ভাবতে পারি না। বগুড়ায় জন্মেছি, বড় হয়েছি। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বিএনপির রাজনীতি ও নীতি -আদর্শ নিয়ে বয়ান শুনে শুনে অভ্যস্ত। সারাজীবন শুনলাম- চীন হচ্ছে বিএনপির পেয়ারে দোস্ত। আপনারা জানেন- বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি ছিল (সচেতনভাবেই ছিল বলছি-কারন এখন আর সেই ঘাঁটি নেই)। সবাই জানে মেজর জিয়ার জন্মস্থান বলেই বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি হয়েছে। কথা সত্য। কিন্তু এতটুকু বললেই বগুড়ার রাজনীতির দর্শন ও গনমানুষের চরিত্র সম্পর্কে ধারনা পরিস্কার হবে না। বাস্তবে বগুড়ার মানুষ প্রচন্ড ভারত বিরোধী। ছোটবেলায় মুরুব্বীদের মুখে গল্প শুনেছিলাম- একদিন বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে সেনা কর্মকর্তাদের দুইজন 'র' এর এজেন্ট হিসেবে ধরা পড়েছিল। সম্ভবত ৮০ সালের দিকের ঘটনা। ঐ দুই বিশ্বাসঘাতককে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের উপর গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। টানা তিনদিন রাস্তায় লাশ ঝুলিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। মূলতঃ এই ছোট্ট ঘটনাকে আপনারা বগুড়াবাসীর ভারত ঘৃণার ট্রেইলার ভাবতে পারেন। মেজর জিয়া ও বিএনপির ভারতবিরোধী নীতিই বগুড়া এবং সমগ্র উত্তরবঙ্গে তাদের এত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এখন এতটা জনপ্রিয় আর নেই। কেন নেই- আশা করি তার ব্যাখ্যা আর দিতে হবে না। এখন আপনারা যারা গ্লোবাল পৃথিবীর এত্ত বড় বুকওয়ালা নাগরিক, তারা বগুড়া বাসীর এই ভারতবিরোধীতার সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ নিয়ে আমাকে খোঁচা মারতেই পারেন। তবে জেনে রাখুন- বগুড়াসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গের মানুষ বিশ্বাস করে- ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ যদি কোন নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকিতে থাকে, তবে সেই ঝুঁকি একমাত্র ও কেবলমাত্র ভারতের দিক থেকেই আসবে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বাকশালী আওয়ামী সরকার আর তাদের প্রভু রাষ্ট্রের যৌথ প্রযোজনায় বিএনপিকে চুবানীর পর চুবানী দেয়া হলো। ঢাকা সেনানীবাস থেকে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়া করলো। বালুর ট্রাক দিয়ে গুলশানে আটকিয়ে রাখলো। ৫ ই জানুয়ারীর অবৈধ নির্বাচনে কাপড় খুলে ভারত বাকশালীদের গা ধুয়ে দিল। তখন বিএনপি ভাবলো- দাদাদের সাথে পীড়িত না করলে ক্ষমতায় আসা যাবে না। পররাষ্ট্রনীতিকে ১৮০ ডিগ্রী উল্টিয়ে ভারতের দিকে তাক করলো। 'আমরা ভারতের শত্রু নই' বলে মুখে খই ফুটিয়ে প্রমাণ করতে চাইলো বিএনপি ভারতের বন্ধু। কেউ কেউ ভাবলো- মোদি ক্ষমতায় আসলে দুনিয়া উল্টে দিবে। হুম---- মোদি জ্বী আসলো। এক হালি ঘোড়ার আন্ডা প্রসব করলো। ওরে খালা, ভারতের সাথে একদলের যেখানে লিভ টুগেদার চলছে, সেখানে পরকীয়া করে অধিকার আদায়ের চেষ্টা কেমন ছেলেখেলা হয়ে যায়, বুঝতে পারো না। ভারত কোন দুঃখে আওয়ামী সঙ্গী ফেলে বিএনপিকে বুকে টেনে নিবে? কিসের ঠেকা ওদের?

ছাগলামী করতে করতে চীনের ঘরটাও বিএনপি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলো। চীন দেখছে- আমার বন্ধু আস্থাহীনতায় ভোগে, আমার শত্রুর (ইন্ডিয়ার) কাছে যাওয়ার ব্যাকুলতা দেখায়, তখন আমারও তো কিছু করার আছে। এই নে- আওয়ামী বাকশালীরাও আমার বন্ধু। তাতে ইন্ডিয়ার গালে একটা থাপ্পড় হলো, আর রামছাগল বিএনপিকেও মূলা খাওয়ানো হলো। বাকশালীরা চীনাদের বুঝালো- আমরা বাংলাদেশে চাইনিজ ব্রান্ড ডেমোক্রেসি চালু করছি। মানে সরকাররে গৃহপালিত বিরোধী দল। চীনে যেমন ক্ষমতাসীন চাইনীজ কমিউনিষ্ট পার্টি আর তার সাথে গৃহপালিত বিরোধী দল, বাংলাদেশেও তেমন বাকশালী আওয়ামী পার্টি ও তার সাথে হুমু এরশাদ- রওশন ম্যাডামের মজার দল। খাপে খাপ। চীন দেখলো- আওয়ামী লীগ তো আমার খালাতো ভাই। ধর, বুকে টেনে ধর।

বুকে হাত রেখে বিএনপি বলতে পারবে না- তাদের পররাষ্ট্রনীতি আসলে এখন কোথায় আছে? পৃথিবীর ইনফ্লুয়েন্সিভ রাষ্ট্রগুলোও বিএনপির দুর্বোধ্য পররাষ্ট্রনীতি স্টাডি করতে পারে না। কোন দেশ, কিসের ভিত্তিতে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে ভাই? আপনি নির্যাতিত, বাড়ি ছাড়া, সন্তানহারা, নির্বাসিত, মজলুম- ঠিক এই কারনেই আপনাকে ক্ষমতায় আনতে হবে? এই সংজ্ঞায় বর্তমান শাসকগোষ্ঠিও বাবা হারা, গ্রেনেড খাওয়া, জেলে যাওয়া, ত্যাগ স্বীকার করা দল। আসলে আন্তর্জাতিক ইনিশিয়েটরদের কাছে বিএনপির মেসেজ কি? একদিকে বাকশালী শাসকরা তাদের চিরন্তন বন্ধুদের সাথে নিয়ে প্রতিপক্ষের বিএনপির দীর্ঘদিনের বন্ধু চীনকেও প্রেমের ভাগ দিতে চাইছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে খামোশ বলে, তখন আপনি যতই অবাক হোন না কেন- পেছনে রাশিয়ার বড় হাতের ছায়াটাও দেখতে হবে।

ধুর, এৎ কথা বলে কি লাভ?
কে শুনবে, আমার প্রলাপ?

এসএসসিতে উচ্চতর গনিত পড়েছিলাম। ভাবতাম এসব গনিতের জটিল সমীকরণ বাস্তব জীবনে কি কাজে লাগবে? গনিতে ভালই ছিলাম। বরাবর জটিল সবকিছু নিমিষেই সমাধান করতাম। কিন্তু মাগার, বিএনপির উচ্চতর পররাষ্ট্রনীতি ! এই জটিল সমীকরণ সমাধানের ক্ষমতা আমার মত সাধারন নাগরিকের নেই। আর বিএনপির সাধারণ মানুষের দরকারও নেই। উচ্চমাঙ্গের এলিট কোটেড-বুটেড লোকের পার্টি হলেই চলবে। গুলশানে কি আর সবার জায়গা হয় রে ভাই?

আচ্ছা- আমার পিএইচডি'র এই টপিক আপনাদের পছন্দ হয়েছে তো ?